জিরো শুল্ক আসলে জিরো নয় |
|||
| ভারতে পণ্য রফতানিতে হরেক বাধা ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দ্রুত দূর করতে না পারলে ভারতের বাজারে ১০০ কোটি ডলার বা ৭ হাজার কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী রফতানি করা কখনোই সম্ভব হবে না। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের কয়েকটি পণ্য বিনা শুল্কে ভারত সে দেশে রফতানি করার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্ত- এই বিনা শুল্কের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। কারণ ভারতে কোনো পণ্যই বিনা শুল্কে রফতানি করার কোনো সুযোগ নেই। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার শুল্ক না নিলেও তাদের রাজ্য সরকার বাংলাদেশে থেকে রফতানিকৃত পণ্য ওপর ঠিকই শুল্ক ধার্য করে রেখেছে। এই শুল্কের পরিমাণ ১৮ শতাংশ। এ ছাড়া আরো হরেক রকম বাণিজ্য বাধার জাল ভারত ছড়িয়ে রেখেছে। এ ধরনের বাধা থাকার কারণে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্তে¦ও এখান থেকে ভারতে রফতানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা জানান, শুল্ক ও অশুল্কের জাল ছিন্ন না করা হলেও ১০০ কোটি ডলারের পণ্যসামগ্রী রফতানি চিন্তা শুধু ¯¦প্নই থেকে যাবে। আর এ কারণে বিনা শুল্কের প্রতিশ্র“তি দেয়া সত্তে¦ও বাংলাদেশ কখনো ভারতে ৮০ লাখ পিস তৈরী পোশাক রফতানি করতে সক্ষম হয়নি। ২০০৭ সাল থেকে এই ‘সুযোগ’ দেয়া হয়েছিল। কথা ছিল প্রতি বছর বাংলাদেশ ৮০ লাখ পিস তৈরী পোশাক ভারতে রফতানি করবে। কিন্ত- এই কোটা কখনো পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রফতানি করা সম্ভব হয়েছে ৬০ লাখ পিস পোশাক। তাই রফতানি বাড়াতে হলে ভারতের ‘জিরো শুল্ক’ যেন ‘জিরো শুল্ক’ই থাকে সে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। গত শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআই তাদের এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উলে¬খ করেছে, বাণিজ্য বাধা দূর ও কানেকটিভিটি (ট্রানজিট) বাড়ানো হলে ভারতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি পণ্যসামগ্রী রফতানি করা সম্ভব। তৈরী পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ভারতের অভ্যন্তরে তৈরী পোশাকের বাজারের পরিমাণ দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৪৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা আমাদের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি (চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার এক লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা)। ভারতের এই অভ্যন্তরীণ পোশাকের বাজার প্রতি বছর ৫০০ কোটি ডলার করে বাড়ছে। কিন্ত- এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের কোনো স্থান নেই। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন¯িটটিউট অব বাংলাদেশে (পিআরআই) বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ বলেছেন, তৈরী পোশাকসহ ভারতের বাজারে ১০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করা কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্ত- তার জন্য প্রয়োজন বাণিজ্য বাধা দূরীকরণ, ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া, সর্বোপরি ভারতের সাথে ‘কানেকটিভিটি’ (ট্রানজিট) বাড়ানো। আর এসবের মাধ্যমে ভারতে আগামী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে ১০০ কোটি ডলার বা সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি পণ্য রফতানি করা সম্ভব হবে। এ স¤পর্কে বাংলাদেশ নিট পোশাক রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি ফজলুল হক বলেছেন, পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে ভারতে ১০০ কোটি ডলারের পণ্যসামগ্রী রফতানি করা সম্ভব কি না সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, আমাদের পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ভারত বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দিয়ে রেখেছে। এ প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, ভারত আমাদের কয়েকটি পণ্য সে দেশে বিনা শুল্কে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। কিন্ত- প্রকৃতপক্ষে আমরা বিনা শুল্কে কোনো পণ্য রফতানি করতে পারছি না। কারণ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার শুল্ক না নিলেও রাজ্য সরকার কিন্ত- ঠিকই শুল্ক নিচ্ছে। এই শুল্কের হার ১৮ শতাংশ। স¤পূরক শুল্কের আওতায় তা নেয়া হচ্ছে। তা হলে কিভাবে বলা হচ্ছে ভারতে আমরা বিনা শুল্কে পণ্য রফতানি করতে পারছি। ৮০ লাখ পিস তৈরী পোশাক রফতানি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছিল প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৮০ লাখ পিস তৈরী পোশাক বিনা শুল্কে রফতানি ভারতে রফতানি করা যাবে। কিন্ত- সেই ৮০ লাখ পিস তৈরী পোশাকের পুরোটা কখনো রফতানি করা সম্ভব হয়নি। সর্বোচ্চ ৬০ লাখ পিস তৈরী পোশাক রফতানি করা সম্ভব হয়েছে। ফজলুল হক বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ পোশাকের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। এই বাজারে আয়তন ২৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর তা পাঁচ বিলিয়ন ডলার করে বাড়ছে। কিন্ত- এই বিশাল বাজারে আমরা প্রবেশ করতে পারছি নানা ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আরোপের কারণে। সরকারকে অনুরোধ করব ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে জিরো শুল্ককে যেন সত্যি সত্যিই জিরো শুল্ক হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়। আর এটি করতে পারলেও ১০০ কোটি ডলার কেন, ভারতে আরো বেশি পরিমাণ পণ্য রফতানি করা সম্ভব হবে। প্রায়ই একই ধরনের কথা বলছেন তৈরী পোশাক খাতের আরো একটি বিশাল সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি আবদুস সালাম মুশের্দী। তিনি গতকাল নয়া দিগন্তকে টেলিফোনে বলেছেন, ভারত একটি বিশাল বাজার। এই বাজারে আমাদের ঢুকতেই হবে। তবে তার আগে বাণিজ্য বাধাগুলো দূর করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফরের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, রাজনৈতিক ইচ্ছাশত্তিপ্ত থাকলেও আগামীতে বাণিজ্য বাধাগুলো দূর করা সম্ভব হতে পারে। তবে আমরাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ভারতের বিশাল বাজার ধরতে। এ জন্য এ বছরই ভারতে তিনটি বস্ত্রমেলার আয়োজনের চেষ্টা করা হচ্ছে। দিলি¬, হায়দরাবাদ ও ব্যাঙ্গালোরে মেলা আয়োজন করা হবে। আমরা চাচ্ছি আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর ভারতকে আমাদের রফতানির তৃতীয় গন্তব্যস্থল করতে। বিনা শুল্কের ব্যাপারে তিনি বলেন, আসলে বিনা শুল্ক বলে কিছু নেই। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার শুল্ক না নিলেও রাজ্য সরকার কিন্ত- ঠিকই শুল্ক নিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ভারতে যেকোনো পণ্য রফতানি করা বেশ কষ্টকর একটি কাজ। বাংলাদেশের ৪৭টি পণ্য ভারত তার নেগেটিভ তালিকায় স্থান দিয়েছে। এর মধ্যে এমন সব পণ্য রয়েছে যা বাংলাদেশের প্রধান রফতানিযোগ্য। তাই এই নেগেটিভ লি¯েটর তালিকা খাটো করে না আনলে কখনো ভারতে ১০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে ভারতে প্রতি বছর বাংলাদেশের রফতানি পরিমাণ হচ্ছে ৩০ কোটি ডলার থেকে ৩৫ কোটি ডলার। গত বছর এই রফতানির পরিমাণ আরো কমেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশ থেকে ২৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। অন্য দিকে, একই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে রফতানি হয়েছে ২৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য। অন্য দিকে, ভারতে থেকে বাংলাদেশের শুধু বৈধ পথে আমদানির পরিমাণ গড়ে ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশী টাকায় ২১ হাজার কোটি টাকা। অন্য দিকে, চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতি বছর ভারত থেকে অবৈধভাবে আরো ২১ হাজার কোটি টাকার পণ্য এ দেশে ঢুকছে। অর্থাৎ বৈধ-অবৈধ সমান সমান।
|






