সাংবাদিকদের বাণী খালেদার শ্রবণ এর পূর্ণ বিবরণ |
|||
| ‘আজকে এখানে কোনো প্রেস কনফারেন্স বা বক্তৃতা করতে আসিনি। আপনাদের সঙ্গে একত্রিত হওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য, লক্ষ্য। দীর্ঘদিন আপনাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। প্রায় দুটি বছর জেলখানায় কাটিয়েছি। গত একবছর মিলিয়ে তিন বছর আপনাদের সঙ্গে দেখা নাই। তাই এই আয়োজন। এর মধ্যে অবশ্য কারো কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। আশা করেছিলাম বের হওয়ার পর আপনারা আমার খোঁজখবর নেবেন। যা হোক সেই সুযোগ হয়নি। তারপরও কষ্ট করে এখানে আসার জন্য আমার নিজের ও দলের পক্ষ থেকে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বক্তব্য সবসময়ই দিই। আজ বক্তব্য দেয়ার কিছু নেই। বক্তব্য দিলে সেটিই বেশি প্রাধান্য পেয়ে যাবে। আপনাদের সঙ্গে আমাদের মিলনমেলা, সেটিই আজ বড় হয়ে থাকুক’। চা-চক্রের শুরুতে দেয়া শুভেচ্ছা বক্তব্যে এইভাবেই সম্পাদক-সাংবাদিকদের স্বাগত জানান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর তিনি নিজ নিজ মতামত রাখার জন্য উপস্থিত সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের আহ্বান জানান। সাংবাদিকদের মধ্যে প্রথম ছয়জনের বক্তব্যের পর খালেদা জিয়া বলেন ‘আশা করবো সিনিয়র, বড় বড় সম্পাদকরা একটু কথা বলবেন। আজ আমরা খোলামেলা কথা বলতে ও শুনতে চাই। ধন্যবাদ’। এরপর মাইক্রোফোন নিয়ে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, এভাবে আপনি আমাদের মাঝেমধ্যেই ডাকবেন। যেহেতু আপনারা মনে করছেন অনেক ইসুতে সরকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারছে না সেহেতু আপনাদের সংসদে যাওয়া উচিত। যেসব ইসুতে আপনারা সংসদে যাচ্ছেন না সেগুলো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। দু’একটি আসন কোনো বিষয় নয়। বলেছেন পরিবেশ সৃষ্টি না হলে আপনারা সংসদে যাবেন না। তাহলে পরিবেশ না হলে আপনারা কি কখনোই সংসদে যাবেন না? সংসদে গিয়ে জনগণের কথা বলুন। একেবারে শেষদিকে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়ার ডানপাশে বসা প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা। তিনি বলেন, আমাদের আর তাহাদের সবার প্রতিনিধি আজ এখানে। আপনি শুধু নেত্রী নন, জনগণের প্রতিনিধিও। আমরা খোঁজ নিতে না পারলেও জেলে যাওয়ার আগে আপনি আমার খোঁজ নিয়েছেন। এজন্য ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, সংসদ কাউকে ইজারা দেয়া হয়নি। আপনারা সংসদে দাঁড়িয়েই কথাগুলো বলবেন। আমাদের পুলিশ পেটালে আমরা রাস্তায় শুয়ে পড়ি। একইভাবে আপনাদেরও সংসদে যদি পেটানোও হয় তাহলে ফ্লোরে শুয়ে পড়-ন। তবুও সংসদ ছাড়বেন না। আমরা শক্তিশালী বিরোধী দল চাই। আরেকজন প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদ নিজে কিছু বলার আগে উঠে গিয়ে মাইক্রোফোন দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে। তাকে কিছু বলার অনুরোধ জানান। পরে মতিউর রহমান বলেন, অনেক কথা হয়ে গেছে। আমরা ছাত্র ধর্মঘট, হরতাল, অবরোধ চাইনা। এর আগে ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট সম্পাদক মাহবুবুল আলম বলেন, আমরা চাই গণতন্ত্র সুসংহত হোক। গণতন্ত্রের অনেক এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে। আর না। মাহফুজ আনামের বক্তব্য শেষে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ এর সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে আপনাদের দলের কমিটি গঠনে সমস্যা কোথায়? এটা আমার একটি প্রশ্ন। একথা সত্য যে সংস্কার কখনো চাপিয়ে দিয়ে হয়না। কেউ চাপিয়ে দিতে চাইলে আমরা বিরোধিতা করি। মনে হচ্ছে দলগুলো নিজেদের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা করবে না। না করলে গণতন্ত্র নিয়ে আমরা ভরসা পাই কিভাবে। নূরুল কবিরের পর মাইক্রোফোন নেন ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন। তিনি বলেন, মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে আমি একমত। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটিই বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দল। দুটি দলের কর্মকাে র ওপরই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকখানি নির্ভর করে। বিএনপি নিজস্ব শক্তির ওপর ভর করে আরো গঠনমূলক ভূমিকা রাখলে আমরা সবাই উপকৃত হব। দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র যারা করেছেন তারা এই হলেও (অনুষ্ঠানস্থল) আছেন, দলের ভেতরেও আছেন, টেলিভিশনেও আছেন। এরপর কালের কণ্ঠ সম্পাদক আবেদ খান বলেন, আমরা মনে করি সংসদের ভেতর দিয়েই আপনাদের দায়িত্ব পালন করা উচিত। দেশের মানুষও এটা প্রত্যাশা করে। ’৮৭ তে যখন আপনারা দুই নেত্রী একত্রে বসেছিলেন জনগণ তখন সাধুবাদ জানিয়েছে। আপনাদের ভেতরে কিছু থাকলে নিজেরা সরাসরি কথা বলবেন। এই কালচার তৈরি করা দরকার। এতে গণতন্ত্র আরো নিশ্চিত হবে। পারস্পরিক কুশল বিনিময় করবেন। হ্যাঁ, ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যুর পর আপনি প্রধানমন্ত্রীর বাসায় গেছেন। দূর থেকে কেন আপনারা সংলাপ বিনিময় করবেন, এটা বোধগম্য নয়। আপনাদের দূরত্বের কারণে গণতন্ত্র বিপদে পড়লে এর দায় কেউ উপেক্ষা করতে পারবেন না। আবেদ খানের পর ইংরেজি দৈনিক অবজারভারÑ এর সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, আমরা প্রতিবাদ করিনি তা ঠিক নয়। সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ আমরা সবসময়ই করেছি। এসময় খালেদা জিয়া বলেন, ‘সবার কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে কেউ কেউ’। পরে ইকবাল সোবহান বলেন, সাংবাদিক হিসেবে আমরা কখনো উদ্যোগ নিয়েছি, কখনো ব্যর্থ হয়েছি। আশির দশকে দুই নেত্রীকে মুখোমুখি এনে আমরা রাজনৈতিক ভূমিকা রেখেছিলাম। ’৯০ এ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও আমাদের ভূমিকা ছিল। দুঃখের বিষয় ’৯০ এর পর আমরা বিভাজনের শিকার হয়েছি। আমরা সাংবাদিকরাও বিভাজিত। আপনারা যারাই সরকারে কিংবা বিরোধী দলে থাকবেন কিছু জাতীয় ইসুতে ঐক্যবদ্ধ হবেন। ভারতে যখন কোনো সমস্যা আসে তারা আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য সৃষ্টির চেষ্টা করেন। আমরা মনে করি যত ব্যক্তিগত বাধাই থাকুক না কেন, জাতীয় ইসুগুলোতে আপনারা একমত হোন। ওয়ান ইলেভেনের পর যখন আপনাদের ওপর আঘাত আসে তখনও আমরা ভূমিকা রেখেছি। আপনারা আছেন, থাকবেন। এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা। পুরুষ শাসিত এই সমাজে আপনারা আমাদের শাসন করছেন। দু’জন যদি রাজনৈতিক মৌলিক ইসুতে একমত হন তাহলে গণতন্ত্র সুরক্ষা হবে। তিনি আরো বলেন, বিভাজনের কারণে আমাদের সাংবাদিকদের ওপর যখন আঘাত আসে তখন একপক্ষ প্রতিবাদ করতে পারিনা। এত্থেকে উদ্ধার করতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার। এই বিভাজন না থাকলে আরেকটি ওয়ান ইলেভেন আসবে না। আপনারা যদি সেনাকুঞ্জে এক হতে পারেন তাহলে গণতন্ত্রের কুঞ্জে এক হবেন না কেন? অসুবিধা বা বাধাটি কোথায়। আপনারা এক হলে সঙ্গে আমরাও বিভাজন শেষ করে এক হতে পারব। আমি, রিয়াজ ভাই, রুহুল আমিন গাজী এক হতে পারব। তখন আপনার ওপর আঘাত এলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা প্রতিবাদ জানাতে পারব। একইভাবে শেখ হাসিনার ওপরও কোনো আঘাত এলে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করব। এরপর ইংরেজি দৈনিক নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আমি আর ইকবাল ভাই এক আছি। এসময় পাশে বসা একজন সাংবাদিক তার উদ্দেশে বলেন ‘আপনাদের কারণেই আমরা ভাগ হয়েছি’। পরে রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আপনাদের সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এখানে কোনো শর্ত দিয়ে সংসদে যাওয়ার কথা হয়নি। কবে যাবেন? শুধু কি সই করে বের হয়ে আসবেন না-কি জনগণের জন্য ভূমিকা রাখবেন? জবাবে খালেদা জিয়া বলেন ‘এগুলো যথাসময়ে জানবেন। আগে বললে তো সব মজা শেষ হয়ে যাবে’। চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, আমরাও মনে করি আপনাদের সংসদে যাওয়া দরকার। ভাংচুর, হরতাল এগুলো প্রতিবাদের ভাষা হওয়া উচিত নয়। আপনি বললেন, আমরা খবর নিইনি। তখন সংবাদপত্রের চেয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বেশি ভূমিকা রেখেছে। জেলখানায় আপনাদের যিনি দেখাশুনা করতেন সেই ব্রিগেডিয়ার কখন বের হবেন, তার কাছ থেকে আপনাদের বিষয়ে জানার জন্য জাতি অপেক্ষা করতো। ইলেকট্রনিক মিডিয়া সেগুলো খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতো। তিনি আরো বলেন, দলীয় কার্যালয়ে আপনাদের মিটিংগুলো সবসময় শুরু হয় রাত আটটার পর। শেষ হতে ১০টা, ১১টা বাজে। এর ফলে কখনোই আমরা রাত সাড়ে দশটার আগে বিরোধী দলের সংবাদ ধরাতে পারিনা। দেশবাসী বিরোধী দলের কর্মকা জানতে চায়। বিনীত অনুরোধ, এসব সিডিউল যেন একটু আগে হয়। শাইখ সিরাজের পর মাইক্রোফোন নিয়ে বার্তা সংস্থা এপি’র ব্যুরো প্রধান ফরিদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর আপনি বলেছেন একটি গোপন চুক্তি করা হয়েছে। আপনার মতো ব্যক্তি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন এটা বলেন তখন সেটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পরে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বললেন এই ধরনের কোনো গোপন চুক্তি হয়নি। হয়ে থাকলে আপনাদেরকে প্রমাণ করতে বলেছেন। এর ফলে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে। এটার নিরসন দরকার। গোপন চুক্তির বিষয়টি অনুসন্ধান করতে আপনিও আপনার দলের পক্ষ থেকে কোনো কমিটি করবেন কি-না। এরপর দাঁড়ান বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী। তিনি বলেন, আপনি আজ এখানে সবাইকে আমন্ত্রণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যখন এই ধরনের প্রোগ্রাম করেন তখন তিনি কিন্তু সবাইকে আমন্ত্রণ করেন না। কেন করেন না জানিনা। তিনি বলেন, আমরা চাই বিরোধী দল মাঠে এবং সংসদে ভূমিকা রাখুক। জনগণের পক্ষে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং সাংবাদিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপনারা কোনো কর্মসূচি দেবেন কি-না। ইত্তেফাকের কবি আল মুজাহিদী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের প্রেতাÍারা, যারা আমাদের ওপর ভর করেছিল তারা এখনো কাজ করছে না এটা বলা যাবেনা। সংসদও খোলা, রাজপথও খোলা। এখনো সময় আছে, আপনারা যদি সাবধানে পা না রাখেন তাহলে আবারো বিপদ আসবে। দৈনিক আমার দেশÑ এর সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, আপনি মানুষ হিসেবে আজ আমাদের দাওয়াত করেছেন। মানুষকেই দাওয়াত দিয়েছেন। মানুষের দাওয়াতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এসেছেন। যুগান্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি বলেন, আপা, সংসদের চেয়ারগুলো আপনাকে ডাকছে। যদি ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলা যায় না। আপা কবে আসবেন। সম্পাদক-সাংবাদিকদের বক্তব্য পর্বে প্রথমেই মাইক্রোফোন নেন ইনকিলাবের আব্দুল আউয়াল ঠাকুর। এরপর নিউজ টুডে পত্রিকার নগর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আপনাকে যখন মাইনাস করতে চেয়েছিল তখন আমরা ক’জন বিরোধিতা করি। তার বক্তব্য শেষে মাইক্রোফোন নেন মাহমুদ শফিক। তিনি নিজেকে কবি ও বিচিত্রার সাবেক প্রধান প্রতিবেদক পরিচয় দেন। এরপর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সভাপতি আব্দুস শহীদ বলেন, আমরা সাংবাদিকরা ভালো নেই। জরুরি সরকারের আমলে আমরা নির্যাতিত হয়েছি। টিভি টক শো নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিলো। আমাদেরকে কালো তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ছিল। নির্বাচনের পর কি দেখলাম! দেশের যে প্রান্তেই যে কলম ধরেছে তাকে নির্য়াতনের শিকার হতে হচ্ছে। কুষ্টিয়া, পাবনাসহ সারাদেশে এই ধরনের ঘটনা। সাংবাদিকরা আক্রান্ত হলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে। একটি বড় দল হিসেবে আপনাদের যে ভূমিকা রাখা উচিত ছিল তা আমরা করতে দেখিনি। নয়াদিগন্তের মাসুদ নিজামী বলেন, আওয়ামী লীগ দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হলে জনগণ বিরোধী দলের ভূমিকা আশা করে। কিন্তু বিরোধী দলের ভূমিকা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছে জনগণ।
|









