সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ঢাকা শহরেই এক বছরে ৩২৪ মৃত্যু |
|||
| পাঁচ বছর আগে রাজধানীর শ্যামলী শিশুমেলার সামনে সড়ক দুর্ঘটনার আহত হন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জুনায়েদ বিন সিদ্দিকী। তাঁর একটি হাত ও পা ভেঙে যায়। হাত জোড়া লাগলেও চিকিত্সকেরা তাঁর একটি পা কেটে ফেলেন। গত রোববার রাজধানীর কাফরুলে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) চিকিত্সাধীন জুনায়েদ জানান, তিনি পাঁচ বছরে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। একই হাসপাতালে চিকিত্সাধীন সিরাজগঞ্জের এম এ মতিন কটন মিলের স্টোর ইনচার্জ মাহফুজুর রহমান। গত দুই ডিসেম্বর সকালে ধানগড়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। শুধু জুনায়েদ বা মাহফুজ নন, সড়ক দুর্ঘটনায় এমন আহত মানুষের সংখ্যা অনেক। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে ঢাকা মহানগরেই ২০০৯ সালে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩২৪ জন, আহত ২৭২। চালকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৪০টি। পথচারীর কারণে ১২টি। এই হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ঢাকা শহরে ৪৬টি দুর্ঘটনার মামলা হচ্ছে। তবে এ রকম দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, সব দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে; বিশেষ করে মৃত্যু না হলে মামলা হয় না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮ সালে সারা দেশে বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে চার হাজার ৪২৬টি। এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছে তিন হাজার ৭৬৪ জন, আহত তিন হাজার ২৮৪। দুর্ঘটনার কারণে প্রতিবছর ৫৬ কোটি টাকার জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। ৩ ফেব্রুয়ারি কাকরাইলে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্র হামিম শেখের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন তার মা সোনিয়া শেখ। ঘটনায় সময় তিনি আহত হন। এর দুই দিন পরই বিমানবন্দর সড়কে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কাছে মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসের চাপায় মৃত্যু হয় সাত বছরের শিশু সুমি আক্তারের। আহত হন মা হাসিনা বেগম (২৬) ও তাঁর ১৪ মাস বয়সী ছেলে হাসান। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডেটা বিশেষজ্ঞ কাজী জাকারিয়া ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছে যে পরিসংখ্যান আছে সে অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন থানায় গড়ে প্রতিদিন ১৫টি করে মামলা হচ্ছে। এর বাইরে অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগীরা ঝামেলা এড়াতে থানায় মামলা না করে মীমাংসার পথে যায়। এই গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, রাস্তার জ্যামিতিক ত্রুটি, নেশাগ্রস্ত হয়ে গাড়ি চালানো, পথচারী ও যাত্রীদের অসাবধানতাসহ ১৭টি কারণ চিহ্নিত করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে চার লাখ ৬৯ হাজার ৬৬০টি মামলা হয়। এ সময় আর্থিক জরিমানা হিসেবে ২০ কোটি ৮৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। আটক করা হয় ১১ হাজার ৫৪৫টি যানবাহন। ভুয়া লাইসেন্স: পুলিশ-র্যাব পৃথক অভিযান চালিয়ে গত বছর জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির সঙ্গে জড়িত ১৫টি চক্রের ১০৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের কাছ থেকে জাল লাইসেন্স তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। র্যাব সূত্র জানায়, মিরপুর বিআরটিএ এবং কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয় ঘিরে জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরির কয়েকটি চক্র সক্রিয়। বিআরটিএ অফিসের আশপাশে অবস্থান করা দালাল চক্রের মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তি এই জাল লাইসেন্স সংগ্রহ করে যানবাহন নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছে। দক্ষ চালক বাড়ানোর চেষ্টা: ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং নিরাপদ সড়ক চাই-এর উদ্যোগে জানুয়ারি মাস থেকে দক্ষ চালক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। পরিবহনশ্রমিক ও চালকদের সচেতনতা এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও পরিবহন কমিউনিটি পুলিশ যৌথ উদ্যোগে ঢাকা মহানগরের তিনটি বাস টার্মিনাল-গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদে চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি ট্রাফিক বিভাগে প্রতি মাসে দুটি করে প্রশিক্ষণ কর্মশালা চলছে। এসব কর্মশালায় দুর্ঘটনার কারণ, ট্রাফিক আইন ও সঠিক নিয়মে গাড়ি চালনার বিষয়ে পাঠদান করা হয়। একই সময় নিরাপদ সড়ক চাই রাজধানীর কাকরাইলে একটি ড্রাইভিং ইনস্টিটিউট চালু করেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংগঠনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষিত চালক হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। সে জন্য তিনি এসএসসি পাস করা গরিব বেকার যুবকদের বিনা মূল্যে গাড়ি চালানো শেখার জন্য এই ইনস্টিটিউট চালু করেছেন। তিনি মনে করেন, গাড়ি চালকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পথচারীদেরও সচেতন হওয়া জরুরি। উভয় পক্ষ সচেতন হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫২ জন। জরুরি বিভাগ থেকে চিকিত্সা নিয়েছে ১৪৫ জন। আগারগাঁও ডাম্পিং স্টেশনের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট সাজ্জাদ কবির জানান, এখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫টি গাড়ি পাঠানো হচ্ছে। এগুলোর বেশির ভাগই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এ ছাড়া বিভিন্ন থানার সামনে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত গাড়িগুলো আটক রাখা হয়।
|









