বিএনপি সংসদে যাবে, রাজপথেও থাকবে |
|||||
গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে বিএনপি সংসদে যাবে এবং সরকারের জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য রাজপথেও থাকবে বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল সোমবার বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সম্মানে বিএনপি চা-চক্রের আয়োজন করে। সেখানেই খালেদা জিয়া এ কথা বলেন। বিএনপির চেয়ারপারসন সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজনীতি করছি নিজে কিছু পাওয়ার জন্য নয়; আমার উদ্দেশ্য দেশকে কিছু দেওয়া। আপনারা আমাকে সহযোগিতা করুন, অতীতেও দেশের প্রয়োজনে যেমনটা করেছেন।’ তিনি বলেন, বিএনপি মনে করে, জরুরি সরকারের চেয়ে নির্বাচিত সরকার ভালো, তাই গণতন্ত্র যেন হুমকির মুখে না পড়ে, সে জন্য বিএনপি সচেতন আছে। এর আগে সম্পাদকেরা বিএনপিকে সংসদে যেতে এবং হরতালের মতো কোনো কর্মসূচি না দেওয়ার আহ্বান জানান। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবিএম মূসা বলেন, ‘সংসদে যান। নানা আন্দোলনের সময় যেভাবে সরকারের বাধার মুখে রাজপথে শুয়ে পড়েন, তেমনি সরকার সংসদে যেতে যতই বাধা দিক না কেন, সংসদ আঁকড়ে থাকুন।’ ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামও বলেন, ‘আপনাদের সংসদে যাওয়া উচিত। এটাই আমাদের চাওয়া। আপনারা যেসব কারণে সংসদ বয়কট করেছেন, তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যাওয়ার পরিবেশ না থাকলেও যান।’ যুগান্তর-এর সম্পাদক সালমা ইসলাম বলেন, ‘যদি কেউ ডাক শুনে না আসে, তবে কবি একলা চলার কথা বলেছেন। কিন্তু সংসদ তো আর একলা চলছে না। আপনি আসুন।’ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবিএম মূসা বলেন, ‘সংসদ কোনো দলের কাছে ইজারা দেওয়া হয়নি। সংসদের শক্তিকে কাজে লাগান। ওখানে বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের শক্তিকে সংখ্যা দিয়ে গণনা করা বিএনপির জন্য ঠিক হবে না।’ নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ জানতে চান, ‘আপনারা কেন এত দিন সংসদে গেলেন না, কবে যাবেন এবং কেবল স্বাক্ষর করে বেরিয়ে আসবেন কি না?’ খালেদা জিয়া বলেন, ‘সময়মতো সংসদে যাব। এখনই সব বললে তো মজা থাকবে না।’ ভারতের সঙ্গে সরকারের কথিত গোপন চুক্তির বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা একটি পত্রিকায় এ সংক্রান্ত খবর পড়েছি। এর বেশি তো আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারকে চুক্তি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনার জন্য বলেছি। কিন্তু এত দিনে চুক্তির বিষয়গুলো সংসদেও উত্থাপন করা হয়নি।’ প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বিএনপি যদি হরতাল, অবরোধ ও ছাত্রধর্মঘট করে, তবে আমরা অবশ্যই এর বিরোধিতা করব। অতীতে আওয়ামী লীগ যখন এটা করেছিল, তখনো বিরোধিতা করেছি।’ জনগণের সমস্যার কথা চিন্তা করে এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিএনপির নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে মেয়েদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, আপনি মতি সাহেব তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানানো কি আমার কর্তব্য নয়? আপনি করেছেন, আমরাও আমাদের মতো করব।’ তিনি বলেন, গত এক বছরে বিএনপি হরতালের মতো কর্মসূচি দেয়নি, বরং সরকারের ভেতর থেকে কিশোরগঞ্জে হরতাল করা হয়েছে। সংগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক আবুল আসাদ বলেন, ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি করা হয়েছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কাজ যেন না হয় সে জন্য বিরোধী দলের উচিত সরকারকে সহযোগিতা করা। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি রহুল আমিন গাজী জানতে চান, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চুক্তি বিষয়ে বিএনপি কোনো কর্মসূচি দেবে কি না। আন্দোলন বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী যেকোনো বিষয়ে বিএনপি সজাগ থাকবে। রাজপথে থাকবে। তিনি বলেন, বিএনপির সময়ে দ্রব্যমূল্য কম ছিল। সার ও ডিজেলের দাম কম ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিকে বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে নিচ পর্যন্ত কেউ সত্যি কথা বলেন না।’ সাপ্তাহিক এখন-এর সম্পাদক আতাউস সামাদ দুই নেত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানান। কালের কণ্ঠ-এর সম্পাদক আবেদ খান বলেন, ‘দুই নেত্রী সরাসরি কথা বলুন। এই সংস্কৃতির চর্চা করুন। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। জনগণ আস্থা পাবে।’ দি ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার সম্পাদক মাহবুব আলম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সবাই একসঙ্গে কাজ করুন। তা না হলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ দি অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘সেনাকুঞ্জে গিয়ে আপনারা (খালেদা-হাসিনা) এক হতে পারেন, কিন্তু জনগণের কুঞ্জে কেন এক হতে পারেন না? আপনারা সেনাবাহিনীর নেতা নন, আপনারা জনগণের নেতা।’ বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘বিএনপি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। এ জন্য সরকারকে সহযোগিতা করার কথাও বলেছিলাম। কিন্তু সরকার তো সহযোগিতা চায় না।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের সব প্রয়োজনে বিএনপি সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে। কিন্তু সরকার আমাদের কখনো তো ডাকছে না। সুসম্পর্ক হতে হলে তো দুই পক্ষ থেকেই হতে হবে। এক পক্ষ সম্পর্ক কতটা টেনে নিতে পারে!’ নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির জানতে চান, ‘দলগুলোর সব পর্যায়ের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আসলে সমস্যা কোথায়?’ জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি পঞ্চম কাউন্সিলে বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব উপহার দিয়েছে। ধীরে ধীরে এটা আরও অগ্রসর হবে। ইনকিলাব-এর সম্পাদক এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, ‘১১ জানুয়ারির পর যে ষড়যন্ত্র হয়েছে, তা দুই পরিবারকে ধ্বংসের জন্য হয়েছিল। ওই ষড়যন্ত্রে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকে এই হলের মধ্যে, আপনার দলের মধ্যে কিংবা টিভির পর্দায় আছেন।’ বক্তব্যের শুরুতে দেশব্যাপী সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদ জানান খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের আড়ালে বর্তমান সরকার জরুরি অবস্থার সরকারের মতো আচরণ করছে। আওয়ামী লীগ অতীতে যেমন গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করেছে, এখনো তা করতে চাইছে। খালেদা জিয়া বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় না যেতে পারে, কিন্তু ৩০ আসন পাওয়ার মতো দল বিএনপি নয়। তিনি বলেন, এই কমিশন বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করেছিল। খালেদা জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘সেখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা থাকতে পারছে না। উপাচার্যকে বলেও কাজ হয় না। তিনি তো দলীয় লোক।’ অনুষ্ঠানে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত মাহমুদ, মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা, বার্তা পরিচালক শাইখ সিরাজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির অনেক সদস্যও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
|










