পুলিশ ব্যস্ত নানা কাজে, টহল কমায় ছিনতাই বেড়ে গেছে |
|||
| ঢাকা মহানগর পুলিশে সদস্যসংখ্যা ২৪ হাজার ৪০৬ জন। এর মধ্যে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিয়মিত টহল ও অপরাধ দমনে নিযুক্ত প্রায় ১২ হাজার সদস্য। এর এক-তৃতীয়াংশ ব্যস্ত একুশের বইমেলা, বাণিজ্য মেলা এবং এসএ গেমসের নিরাপত্তা নিয়ে। এর ফলে নগরের ৪১টি থানায় টহলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। আর এ সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আবার ছিনতাই বেড়ে গেছে। এমনকি ছিনতাইসহ নিয়মিত মামলার তদন্তও ব্যাহত হচ্ছে। গত বছরের আগস্টে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ সে সময় কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল। ওই সময় বেশ কিছু ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হলে রাজধানীতে ছিনতাই কমে যায়। কিন্তু কিছু দিন ধরে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য আবার বেড়ে যাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে গত ১ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে ২৬০টি ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া গেছে। ছিনতাইকারীদের হাতে আহত হয়ে অন্তত ১২৩ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানসহ (পঙ্গু হাসপাতাল) আশপাশের ক্লিনিকে চিকিত্সা নিয়েছেন। ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ইউনুস আলী নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক নিরাপত্তাকর্মী খুন হন। তবে মহানগর পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময় বিভিন্ন থানায় ছিনতাই ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে মাত্র ৫১টি। জানা গেছে, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে আহত না হলে বাড়তি হয়রানির আশঙ্কায় বেশির ভাগ ভুক্তভোগী থানায় মামলা করতে যায় না। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এ কে এম শহীদুল হক ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তায় পুলিশি টহল কিছুটা কমে যাওয়ায় এমনটি হচ্ছে। টহল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশ কমিশনার বলেন, একুশের বইমেলা, বাণিজ্য মেলা ও এসএ গেমসের নিরাপত্তায় পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশসদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এসএ গেমসের খেলোয়াড়দের আবাসিক হোটেলের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। খেলোয়াড়দের আসা-যাওয়ার নিরাপত্তায় পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। তিনি অবশ্য জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনার তদন্তও হচ্ছে। কিছু ঘটনা: গত ২১ জানুয়ারি ভোরে কয়েকজন ছিনতাইকারী শান্তিবাগে জোবায়ের ফারুক (২০) নামে এক যুবককে চাপাতি দিয়ে আঘাত করে মানিব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আশপাশের লোকজন ছিনতাইকারী হূদয় (২০) ও বাবুলকে (২০) আটক করে ধোলাই দেয়। ঘটনাস্থল থেকে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে তাদের কাছ থেকে দুটি রক্তমাখা চাপাতি উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই দিন দুপুরে যাত্রাবাড়ী থানার কাছে স্থানীয় দুই ছিনতাইকারী মিন্টু ও জুলহাস গৃহবধূ ফাতেমা আক্তারের রিকশার গতিরোধ করে এবং অস্ত্র ঠেকিয়ে একটি স্বর্ণের চেইন নিয়ে যায়। ফাতেমা আক্তারের অভিযোগ, থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। এ ব্যাপারে যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, তাঁকে অপেক্ষা করতে বলা হলে তিনি অভিযোগ না রেখেই চলে যান। ওই দিনই রাত পৌনে একটার দিকে চার ছিনতাইকারী মিরপুরের লালকুঠি মাজারের সামনে চা-দোকানি স্বপন মিয়ার (১৮) পেটে ছুরি মেরে তাঁর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। একই রাতে পাঁচজন ছিনতাইকারী রাজউক ভবনের কাছে গৃহবধূ কামরুননাহারের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। গত ২৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়াবাদের ই ব্লকে ইউনুস আলী (৪০) নামের এক বেকারি ব্যবসায়ীকে গুলি করে তিন লাখ টাকা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। পুরান ঢাকার বাংলাবাজার মোড়ে ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে চার ছিনতাইকারী কাপড় ব্যবসায়ী ফরিদ খানের পায়ে গুলি করে ১১ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। একই দিন মধ্যরাতে শেরেবাংলা নগরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনের রাস্তায় ছিনতাইকারীরা একটি আইসক্রিম কোম্পানির গাড়ির গতিরোধ করে প্রতিষ্ঠানের কোষাধ্যক্ষ আবু কাওছারকে (৩৫) গুলি করে দেড়লাখ টাকা নিয়ে যায়। ওই দিনই সৌরভ কেমিক্যাল অ্যান্ড ওয়ার্কশপের হিসাবরক্ষক সেলিম সরদার (২৫) তাঁর সহকর্মী সুমনকে নিয়ে ইসলামী ব্যাংক (শ্যামলী শাখা) থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা তুলে মোটরসাইকেলে অফিসে ফিরছিলেন। শ্যামলী ১ নম্বর সড়কে জনসেবা ক্লিনিকের সামনে ছিনতাইকারীরা তাঁদের গতিরোধ করে সেলিম সরদারের বাঁ পায়ে ও ডান হাতে ছুরিকাঘাত করে টাকাসহ ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। ওই দিন দুপুর সোয়া একটার দিকে জুরাইন রেলগেটের সামনে তিনটি মোটরসাইকেলে ছয় ছিনতাইকারী বাংলালিংকের বিক্রয়কর্মী আল-আমিনের (৩০) কাছে থাকা আড়াই লাখ টাকা ও ৮০ হাজার টাকার মোবাইল ফোন কার্ড নিয়ে যায়। ছিনতাইকারীরা তাঁর হাত ও পায়ে গুলি করে। ২ ফেব্রুয়ারি দুপুর দুইটার দিকে গুলশান নিকেতনে একটি বিস্কুট কারখানার দুটি ভ্যান ছিনতাইয়ের সময় জনতা ছিনতাইকারী ফারুক (২৫) ও নুর ইসলামকে (২৬) আটক করে ধোলাই দেয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সকালের দিকে চার ছিনতাইকারী গুলিস্তান পার্কের কাছে ব্যবসায়ী শ্যাম সাহার পথরোধ করে ২৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। শ্যাম সাহা চিত্কার দিলে পথচারীরা দুই ছিনতাইকারী জব্বার ও সেলিমকে আটক করে ধোলাই দেয়, অন্য দুই ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়। যেসব জায়গায় ছিনতাই হয় বেশি: ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন থানার ওপেন হাউস ডের আলোচনা-পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মহানগরের প্রায় আড়াই শ স্থানে নিয়মিত ছিনতাই হচ্ছে। এসব স্থানে সার্বক্ষণিক পুলিশ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই পুলিশের অনুপস্থিতির সুযোগ ছাড়াও ছিনতাইকারীরা পুলিশের দায়িত্বের পালা বদলের (শিফট বদল) সময় বেশি ছিনতাই করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মিরপুর বেড়িবাঁধ, মিরপুর ১ নম্বর সনি সিনেমা হলের সামনে, পীরেরবাগ মুক্তি হাউজিং, মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোড, কাঁটাসুর, ধানমন্ডির ৮ নম্বর ব্রিজ মোড়, শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু সম্মেলনকেন্দ্রের আশপাশের মূল সড়কে, ফার্মগেটসংলগ্ন ইন্দিরা রোড ও টিঅ্যান্ডটি কার্যালয়ের পেছনের গলি, বনানীর ঢাকা গেট, গুলশান নিকেতন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার তিব্বত মোড়, খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ রেলগেট, কাকলী মোড়, গুলশান শুটিং ক্লাবের সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বর, তিন নেতার মাজারের সামনে, মহাখালী কাঁচাবাজারের সামনে, মগবাজার নয়াটোলা, শ্যামপুরের দনিয়া, আলমবাগ, সূত্রাপুরের ঢালকা নগর, ভজহরি সাহা স্ট্রিটে প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। মিরপুর ২ নম্বরের বাসিন্দা নাজির হোসেন বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছিনতাই কমে গিয়েছিল। কিন্তু ছিনতাই এখন আবার বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিন ভোরে মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে এবং সন্ধ্যায় মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে লোকেরা। র্যাবের মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক দিনে ছিনতাইয়ের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতি নাজুক নয়। তবে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রত্যাশিতও নয়। এ ধরনের ঘটনা যাতে কমে সেদিকে র্যাবের চেষ্টা আছে। ছিনতাইপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে র্যাবের টহল অব্যাহত আছে। পুলিশ কমিশনার শহীদুল হক বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন হতে হবে। টাকা বহন করার সময় পুলিশের সাহায্য নিলে ছিনতাই এড়ানো সম্ভব।
|







